নেই পোল্ট্রি বীমা, নেই নীতিমালা , খাদের কিনারায় প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা

ভালো নেই প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা। বড় পুঁজি আর প্রযুক্তির কাছে প্রতিনিয়ত মার খেতে খেতে তারা খাদের কিনারায় পৌঁছে গেছে। পোল্ট্রি ফিড, এক দিনের মুরগির বাচ্চা ও ওষুধের উচ্চমূল্য, মাঝেমাঝে বার্ড ফ্লুসহ বিভিন্ন রোগের আক্রমণ তাদের দিশেহারা করে দিচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক খামার। ঋণে জর্জরিত এসব খামারিদের দুচোখে এখন শুধুই হতাশা।

সমপ্রতি নরসিংদী ও গাজীপুরে বেশ কয়েকটি খামারে সরেজমিনে গিয়ে খামারিদের দুর্দশার এ চিত্রই দেখা যায়। অনেক খামারে খাঁচা আছে, মুরগি নেই। নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় প্রথম খামার করেন জাহাঙ্গীর হোসেন ভুঁইয়া। ১৯৮১ সালে তিনি ৫শ’ মুরগি নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। প্রথম দিকটা ছিল চমত্কার। তবে তার সফলতার গল্প স্থায়ী হয়নি।

জাহাঙ্গীর হোসেন ভুঁইয়া বলেন, আমার খামারের সফলতায় পলাশ উপজেলায় হৈ চৈ পড়ে যায়। আমি অনেক মানুষকে ১০টা করে মুরগী দিয়েছি খামার করার জন্য। এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে এ এলাকায় খামার। তিনি বলেন, আঘাত আসে ২০০৮ সালের বার্ড ফ্লুতে। টিকতে পারিনি। তখন আমার খামারে ১২ হাজার মুরগি ছিল। কি কিরব? বন্ধ করে দেই খামার।

তিনি বলেন, আমি ছিলাম ঘোড়াশাল পোল্ট্রি মালিক সমিতির সভাপতি। কিন্তু এই এলাকায় এখন খামারই নেই, আর সমিতি থাকবে কি করে? তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কয়েক বছর আগেও এই এলাকায় প্রায় দেড় হাজার খামার ছিল। এখন তা তিন-চার’শতে নেমে এসেছে। একইকথা জানালেন, খামারি আমানুল্লাহ, আব্দুল মান্নান, আতাবউদ্দিন, সেলিম, কাইয়ুম আহমেদ।

খামারি ও পোল্ট্রিফিড বিক্রেতা আমানুল্লাহ বলেন, আগে প্রতি মাসে আমি চার’শ টন খাবার বিক্রি করতাম। এখন তা ৭০ থেকে ৮০ টনে নেমে এসেছে।

এসব প্রান্তিক খামারিরা বলেন, মূলত: পোল্ট্রিখাতে দেশি-বিদেশি বড় বড় কোম্পানির ব্যাপক বিনিয়োগ, এক দিনের মুরগির বাচ্চা, খাবার ও ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে টিকতে পারছেন না তারা। সেইসাথে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকেও দায়ী করে খামারিরা বলেন, এ শিল্পে কোন বীমা নেই, পাওয়া যায় না ব্যাংক ঋণ। ফলে বার্ড ফ্লুর আঘাতে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি খামারিরা। অথচ বর্তমানে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এখানে।

জিম্মি প্রান্তিক খামারিরা, একদিকে বড় পুঁজির দেশি-বিদেশি বড় বড় কোম্পানির কাছে স্বল্প পুঁজির প্রান্তিক খামারিরা অসহায়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকেই মুরগির বাচ্চা, ফিড, ওষুধ কেনার বাধ্যবাধকতা থাকায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন প্রান্তিক খামারিরা।

খামারি সেলিম বলেন, কোন কোম্পানির কাছ থেকে মুরগির বাচ্চা কিনলে সেখান থেকেই ওষুধসহ আনুষাঙ্গিক অন্যান্য সব কিছু কিনতে হয়। কিন্তু দেখা যায়, অন্য কোম্পানিতে হয়তো ওষুধের দাম কম রয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যে পরিশ্রম করি তার মজুরিও পাই না। মজুরি ধরলে আর লাভ থাকে না।
ডিম বেচে লাভ হচ্ছে না, পোলট্রি ফিড, বাচ্চা ও ওষুধের দাম বেশি হওয়ায় ডিমের উত্পাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ডিম বিক্রি করে লাভ করতে পারছেন না প্রান্তিক খামারিরা। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি হালি ডিম (সাদা) বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা। যা গত এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ২৬ থেকে ২৮ টাকা।

খামারিরা জানান, একটি মুরগি ৭৬ সপ্তাহে ৫৬ কেজি খাবার খায়। প্রতি কেজি খাবারের দাম ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা। এই হিসাবে একটি মুরগি খাবার খায় এক হাজার ৯৬০ টাকার। এছাড়া বাচ্চার দাম (বর্তমানে একদিনের লেয়ার বাচ্চা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা), ওষুধ, লেবারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে আরো ব্যয় হয় প্রায় ৪৫০ টাকা। এতে একটি মুরগির দাম পড়ে ২ হাজার ৪১০ টাকা। ডিম পাড়া শেষে মুরগিটি বিক্রি করা যায় (যখন চাহিদা খুব বেশি থাকে) গড়ে ২১০ টাকায়। এ টাকা বাদ দিলে মুরগির দাম পড়ে প্রায় দুই হাজার ২শ’ টাকা। একটি মুরগি গড়ে সর্বোচ্চ ৩০০টি ডিম দিতে পারে। সে হিসাবে প্রতি ডিমের উত্পাদন খরচ পড়ে ৭ টাকা ৩৩ পয়সা। তাহলে লাভ কোথায়? প্রশ্ন খামারিদের।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বলেন, সত্যিকার অর্থেই প্রান্তিক খামারিরা হতাশ। তিনি বলেন, আমাদের কোন ডিম সংরক্ষণাগার নেই। যে কারণে কখনো ডিমের দাম খুব বেড়ে যায় আবার কমে যায়। যদি সংরক্ষণাগার থাকতো তাহলে সারা বছর ডিমের দাম একই থাকতো। এতে ভোক্তারা যেমন উপকৃত হতেন তেমনি খামারিরাও ন্যায্য মূল্য পেতেন। তিনি বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সরকারিভাবে ৬’শটি ডিম সংরক্ষণাগার আছে। অথচ আমাদের সরকারি-বেসরকারিভাবে একটিও নেই। তাহলে আমাদের পোলট্রি শিল্প কিভাবে দাঁড়াবে?

তিনি বলেন, খামারিদের নিজস্ব বিপণন ব্যবস্থা নেই। তারা বিচ্ছিন্ন। ফলে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে চাহিদা অনুপাতে ডিম ও মুরগি উত্পাদন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতি মাসে প্রায় আড়াই কোটি ডিম ও ২৪ থেকে ২৬ লাখ কেজি মুরগি উত্পাদন হচ্ছে বলে তিনি জানান।

গাজীপুরের ২২ খামারির উদ্যোগ

উত্পাদন খরচ কমাতে গাজীপুরের ২২ খামারি নিজেদের খামারের প্রয়োজনীয় ফিড নিজেরাই উৎপাদন করছেন। এতে প্রতি কেজি ফিডের উৎপাদন খরচ পড়ছে ৩০ থেকে ৩৩ টাকা। সমন্বিতভাবে এটা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বলেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার স্বার্থেই এটা আমাদের করতে হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের উত্পাদিত ফিড শুধু দামেই কম নয়, মানেও অনেক উন্নত। প্রতি জেলায় খামারিরা গ্রুপ করে এ উদ্যোগ নিতে পারেন। গাজীপুরের পর ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের খামারিরা এ উদ্যোগ নিয়েছেন বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে পরিষদের পক্ষ থেকে সবধরনের সহায়তা দেয়া হবে বলে তিনি জানান।

নেই পোল্ট্রি বীমা, নেই নীতিমালা

২০১১ সালে আবারও বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ দেখা দিলে তত্কালীন মত্স্য ও প্রাণিসমপদ মন্ত্রী পোলট্রি বীমা চালুর কথা জানান। তবে এখনো তা হয়নি। নেই নীতিমালাও। নীতিমালা না থাকায় এ শিল্পে দুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে বলে ক্ষুদ্র খামারি, বাচ্চা উত্পাদনকারী ও পোলট্রি ফিড বিক্রেতারা অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, এই শিল্পে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ও কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হলেও এখন পর্যন্ত নীতিমালা হয়নি।

পাওয়া যায় না ব্যাংক ঋণ

পোলট্রি খামারিরা অভিযোগ করেছেন, কৃষি খাতের মতো পোলট্রি শিল্পও আট শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার কথা থাকলেও তা দেয় না বেসরকারি ব্যাংকগুলো। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকেই এ হারে ঋণ পাওয়া যায়। খামারি আব্দুল মান্নান বলেন, ঋণ চাইতে গেলে ব্যাংক থেকে বলা হয়, মুরগি মরে গেলে টাকা দেবেন কোত্থেকে? অথচ একটি মাঝারি আকারের খামারেও ১০ থেকে ১৫ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।