শাওনের খামারে বছরে চার কোটি টাকার মাছ

রেজাউর রহমান শাওন। যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর চলে যান অস্ট্রেলিয়া। সেখানকার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ইচ্ছা করলেই থেকে যেতে পারতেন ওখানে। কিন্তু নিশ্চিত উন্নত জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করেই ২০০৮ সালে ফিরে আসেন দেশে। মাছ চাষে স্বর্ণপদক পাওয়া বাবা সাইফুজ্জামান মজুর প্রেরণায় শুরু করেন মাছ চাষ। প্রথম পর্যায়ে পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষে হাতেখড়ি তার। লাভের টাকায় কিনতে থাকেন জমি আর পুকুর। যশোর শহর থেকে যশোর-চৌগাছা সড়ক ধরে ১৮ কিলোমিটার গেলেই রানিয়ালি গ্রামের মাঠে এখন তার ৮৪ বিঘার খামার। নাম দিয়েছেন ‘শাওন মৎস্য চাষ প্রকল্প’। ছোট-বড় মিলিয়ে এ খামারে রয়েছে ১৩টি পুকুর। ১০টি পুকুরে চাষ করেন কার্পজাতীয় মিশ্র মাছ। বাকি তিনটিতে মাছের পোনা নার্সিং করা হয়। কার্পজাতীয় মাছের সঙ্গে ব্রুড মাছেরও চাষ করেন। রেণু পোনা তৈরির জন্য রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, ব্ল্যাক কার্প, গ্রাস কার্পের এই ব্রুড মাছ তার থেকে কিনে নিয়ে যান যশোরের হ্যাচারি মালিকরা। শাওন বলেন, তার ৮৪ বিঘার এই খামারে এখন প্রতি বছর ১ লাখ ২০ হাজার টন মাছ উৎপাদন হয়। যার মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। যশোরে অর্ধশত রেণু পোনার হ্যাচারি রয়েছে। আগে এসব হ্যাচারির মালিকরা হালদা থেকে অথবা বড় বড় নদী থেকে ব্রুড মাছ সংগ্রহ করতেন। এখন তার এই খামারেই তিনি বছরে মানসম্পন্ন ৪ থেকে ৬ হাজার ব্রুড মাছ উৎপাদন করছেন। তার এই উদ্যোগের কারণেই যশোরে ব্রুড মাছের সংকট এখন নেই বললেই চলে। শাওন বলেন, তার এই খামারে মাছ চাষের পাশাপাশি রয়েছে হাঁস-মুরগি আর কবুতরের খামার। পুকুরগুলোর চারপাশে চাষ হয় নানারকম সবজি। ১২০০ মেহগনি গাছ ছাড়াও এখানে রয়েছে সিঙ্গাপুরি ও মালয়েশিয়ান বিভিন্ন জাতের কলা, ডালিম ও খেজুর গাছ।

১২ জন কর্মচারী রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা এসব দেখাশোনা করেন। সার্বক্ষণিক শ্রম দেন তিনি নিজেও। আগামী ১০ বছরের মধ্যে নিজেকে দেশের অন্যতম একজন মাছ রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেন শাওন। বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুকুরের সংখ্যা বাড়বে। বাড়বে তার খামারের পরিধিও। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখনই মাছ রপ্তানির জন্য প্রস্তুত আছেন তিনি। খুলনা থেকে চিংড়ি ও পাঙ্গাশ রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। সেখানে একটা প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাদা মাছ রপ্তানির জন্য কোনো প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। সরকার যদি এ ব্যাপারে সহযোগিতা করে, তাহলে মাছের উৎপাদন যেমন আরও বাড়বে, চাষিরা মাছের ভালো দাম পাবেন, প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন হবে। শাওন আরও বলেন, দেশের অনেক তরুণ-যুবক লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে শ্রম বিক্রি করতে যাচ্ছে। এদের অনেকেই প্রতারিত হয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। অথচ দেশে থেকেই যদি স্বল্প মেয়াদের একটা প্রশিক্ষণ নিয়ে এসব যুবক মাছ চাষ শুরু করে, তাহলে বিদেশে গিয়ে শ্রম বিক্রির চেয়েও দেশে থেকে বেশি লাভ করতে পারবে। তিনি বলেন, এর জন্য নিজের জায়গা-জমি, পুকুর কিছুই দরকার হয় না। নিজের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘আমি নিজেও প্রথম পর্যায়ে পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছিলাম। এখন আমার নিজের ১৩টি পুকুরসহ ৮৪ বিঘার পূর্ণাঙ্গ খামার হয়েছে।’

সাইফুল ইসলাম, যশোর