মানবাধিকার কী….?

আমরা প্রতিটি মানুষের নিরঙ্কুশ ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলি। ব্যক্তিস্বাধীনতা বলতে কী বোঝায়? ব্যক্তি কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে, এটা নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে। সে সীমা লঙ্ঘন করলেই তাকে অপরাধ বলে গণ্য হবে। এখানে নির্বিচারে গ্রেফতার হওয়া থেকে অব্যাহতি লাভের কথা বলা হয়েছে। একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কী করতে হবে, সেটা সেই দেশের পরিবেশ পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

প্রশ্ন হচ্ছে, মানবাধিকার কী? যদিও বলা হয় মৌলিক অধিকার পাঁচটি। কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিতে মানুষের মৌলিক অধিকার হচ্ছে দুটি। একটি খাদ্য, অন্যটি জৈবিক। শিক্ষা, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, দার্শনিক ক্ষেত্রে এর কোনো স্থান নেই। মূলত যে অর্থে মানবাধিকার শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে তা একটু ভিন্ন। জানতে হবে, কোন কোন বিষয়গুলো মানবাধিকারকে অর্থবহ করে তুলছে। মানবাধিকারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে, মানুষের কল্যাণ, মানুষের স্বাধীনতা, মানবিক মূল্যবোধ, সততা, ন্যাপরায়ণতা, প্রেম ইত্যাদি। হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি কল্যাণের বিরোধী। মূলত মানুষের বৈধভাবে বাঁচার যে অধিকার, সেটাই হচ্ছে মানবাধিকার। সেই অধিকারের ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপই হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন। কারও স্বাধীনতাকে হরণ করা, কারও অকল্যাণ করা, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অন্যকে নিপীড়ন করা, হত্যা করা ইত্যাদি হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘন। মানবাধিকারের ক্ষেত্রটি দুটি পর্যায় বিভক্ত। একটি রাষ্ট্রীয়, অন্যটি সামাজিক। অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে তিনটি- প্রতিরোধ, প্রতিশোধ এবং সংশোধন। সর্বোচ্চ বিচার মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে দুটি উদ্দেশ্য প্রধান। প্রতিরোধ এবং প্রতিশোধ। মৃত্যুদণ্ড নির্মম, নিষ্ঠুরভাবে কার্যকর করার মধ্যে দেশ এবং জাতির কোনো মঙ্গল যদি না থাকে তবে বলতে হবে এটাই মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকলাপ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেক সন্ত্রাসী ক্রসফায়ারে নিহত হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ধৃত আসামিকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করার সময় প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়ে থাকে এবং ক্রসফায়ারে স্পটেই অপরাধীর মৃত্যু হয়। এটাকে যদি প্রমাণ করা যায় যে, যা কিছু ঘটনা ঘটেছে, সবই সাজানো। তবেই এটাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলা যাবে। কিন্তু এটা যে সাজানো এটা একটি ‘ধারণা’ মাত্র এবং এ ধারণার কারণেই বলা হয়, এটা মানবাধিকার লঙ্ঘন। তবে স্থান, কাল, পাত্র এবং ক্ষেত্রের বিষয়টি বিবেচনা করলে এটাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলা যাবে না। অনেক ক্ষেত্রে অনেক কিছুই বোঝা যায়, কিন্তু প্রমাণ করা যায় না। বিচারের সময় বিচারক বুঝতে পারছেন, হত্যা মামলার আসামি সে নিশ্চিত খুনি, কিন্তু সাক্ষ্য প্রমাণ নেই। ফলে বিচারক তাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারেন না। সন্ত্রাসীরা আজ যেভাবে মানুষ হত্যা করছে।একটি লোক দ্বারা যদি অন্যায়ভাবে দশটি লোকের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে, তাকে হত্যা করার পক্ষে দর্শনেরও সমর্থন রয়েছে। আর সেটা হবে বৃহত্তর স্বার্থে।

সামাজিক ক্ষেত্রে যেমন- যৌতুকের জন্য নির্যাতন করে স্ত্রীকে হত্যা করা। এসিড নিক্ষেপ করা। সামাজিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে, এর জন্য রয়েছে রাষ্ট্রীয় আইন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে, কে দেখবে? সেক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষার কাজে নিয়োজিত সংস্থাগুলো আজ অনেকটা সক্রিয়। প্রতিবাদ জানাচ্ছে জোরালোভাবে। মূলত মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে এ নিয়ে মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থাগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া প্রয়োজন। মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধপ্রবণ। এই অপরাধপ্রবণতার কারণেই প্রথম ধর্মের প্রবর্তন হয়। ধর্মের প্রধান কাজ হচ্ছে মানুষের কল্যাণ। এই কল্যাণের জন্য ধর্মেও শাস্তির কথা বলা হয়েছে। তবে সে শাস্তি পরোক্ষ। পরবর্তীকালে ধর্মের পরোক্ষ শাস্তি অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না, তখন সৃষ্টি হয় আইন এবং প্রত্যক্ষ শাস্তির বিধান। প্রচলিত আইন যখন অপরাধ দমনে ব্যর্থ হয়, তখন আইনের পরিবর্তন আসে। এমনকি মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিধানকেও অপরাধীরা ভয় পাচ্ছে না। এর একটি কারণ রয়েছে। যেমন- সেরেনটনিন নামে একপ্রকার রাসায়নিক পদার্থ আছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় কারও মধ্যে বেশি সৃষ্টি হলে তার মধ্যে আত্মহত্যাপ্রবণতা জাগতে পারে। ঠিক তেমনি এরকমই মানুষের মধ্যে এমন কিছু ব্যাপার আছে, যা মানুষের মধ্যে থাকলে সে যে কোনো ঝুঁকি নিতে পারে। মৃত্যুকে সে ভয় পায় না। তারা মানুষ হত্যা করতে পারে হাসতে হাসতে। এরা মূলত সমাজের আগাছা। হত্যার অপরাধে বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড প্রদান এক দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। এ জন্য মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি বিচারব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সৃষ্টি, ধ্বংস এবং সব কিছুর পরিবর্তন, সবই সৃষ্টির বিধান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানের উৎকর্ষ এবং জ্ঞানের উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে মতবাদেরও পরিবর্তন ঘটে। কাজেই অপরাধের ধরনের পরিবর্তন বা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আইনেরও পরিবর্তনের দাবি রাখে। অপরাধ যত তীব্র হবে আইন তত কঠোর হওয়া বাঞ্ছনীয়। সমাজে সন্ত্রাসী কর্তৃক হত্যা যত বেশি সংঘটিত হবে, বৈধভাবে আইনের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের হত্যা বা মৃত্যুদণ্ডকে তত ত্বরান্বিত করতে হবে। নতুবা সমাজ হয়ে পড়বে বাস অনুপযোগী। দেশ হয়ে পড়বে নরক সমতুল্য। এ সবই দর্শনের কথা।